বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মী নিয়োগ পুনরায় চালু, জাপানের সঙ্গে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক চুক্তি এবং থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের আলোচনা চলছে।

তবে সব দেশের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের পর্যায় এক নয়। কোথাও নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কোথাও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, আবার কোথাও আলোচনা চলছে। ফলে এসব উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়লেও কতজন কর্মী যেতে পারবেন, কবে যেতে পারবেন এবং তাঁদের অভিবাসন ব্যয় কত হবে, তা সব ক্ষেত্রে এখনো স্পষ্ট নয়।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নতুন করে কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩১ মে’র পর বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শ্রমবাজারটি পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। ২০২৬ সালের অক্টোবরে নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় শুরুর উদ্যোগের কথা জানানো হয়।

নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ৩৩৮টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি প্রসেসিং প্রতিষ্ঠান এবং ৩১২টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।

নতুন ব্যবস্থায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদের কাছ থেকে কর্মীর চাহিদাপত্র সংগ্রহ এবং বাংলাদেশ থেকে কর্মী বাছাইয়ের কাজে যুক্ত হতে পারবে। অন্যদিকে, প্রসেসিং প্রতিষ্ঠানগুলো ভিসাসংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে।

এ ব্যবস্থায় প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়ার নীতিগত সম্মতির কথাও জানানো হয়েছে। তবে কোন খাতে কতজন কর্মী নেওয়া হবে, তাঁদের নির্বাচন কীভাবে হবে এবং কবে থেকে তাঁরা যাত্রা শুরু করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পরিষ্কার নয়।

রেমিট্যান্স পাচ্ছে দেশ, প্রবাসীদের সুবিধায় তালা!
শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্বাচিত কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। তবে এ সুবিধা ১০ হাজার কর্মীর জন্য আলোচিত হওয়ায় একে মালয়েশিয়ায় যেতে ইচ্ছুক সব কর্মীর জন্য বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কতটা স্বচ্ছতা থাকবে এবং কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বন্ধ করা যাবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় এসব সমস্যার সমাধান কতটা হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।

জাপানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি এসেছে নতুন চুক্তির মাধ্যমে। ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির আওতায় ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরুর কথা রয়েছে। চুক্তিটির প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর; নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী তা আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যে কর্মী নিয়োগে সহযোগিতা বাড়ানো, কর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কাজের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা। জাপানে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা ও ভাষাগত যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আগ্রহী কর্মীদের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষরের অর্থ এই নয় যে সব আবেদনকারী সরাসরি জাপানে যেতে পারবেন। নিয়োগদাতার চাহিদা, কাজের ধরন, যোগ্যতা, ভিসার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই কর্মী নিয়োগ হবে।

জাপানে বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও সরকার আগে জানিয়েছে। তবে এই পরিকল্পনাকে নতুন চুক্তির আওতায় নিশ্চিত বার্ষিক নিয়োগসংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে কতজন কর্মী নেওয়া হবে, কোন পেশায় নিয়োগ হবে এবং আবেদনপ্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, তা সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা থেকে স্পষ্ট হবে।

থাইল্যান্ডের শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির আলোচনা চলছে। দেশটি নির্মাণ, কৃষি ও হালাল পণ্যসংশ্লিষ্ট খাতে কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য একটি খসড়া চুক্তি পাঠানোর কথাও সরকার জানিয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়ে আরও তৎপরতা জরুরি ...
তবে খসড়া চুক্তি ও নিয়োগের আগ্রহ প্রকাশের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর কিংবা কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পার্থক্য রয়েছে। ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে কতজন কর্মী নেওয়া হবে, তাঁদের বেতন কত হবে এবং আবেদন কবে শুরু হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আগে থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় কাজের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় কর্মী নিয়োগ এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মৌসুমি কাজের ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২৬ সালে মৌসুমি কর্মী পাঠানোর কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। কৃষি খাতে এ ধরনের কাজের সুযোগ থাকলেও তা স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। কর্মীর কাজের মেয়াদ, বেতন, আবাসন ও অন্যান্য শর্ত সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি এবং নিয়োগচুক্তির ওপর নির্ভর করে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারের সঙ্গেও দক্ষ কর্মী নিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দুই দেশের যৌথ কমিটির বৈঠকে কাতার বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের কারিগর ও ওয়েল্ডার নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে।

এ উদ্যোগে নির্দিষ্ট পেশায় দক্ষ কর্মীদের জন্য সম্ভাবনা তৈরি হলেও কতজন কর্মী নেওয়া হবে, কোন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেবে এবং কী শর্তে নিয়োগ হবে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত না হলে সুযোগের প্রকৃত পরিধি বোঝা কঠিন।

ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের শ্রমবাজার সম্প্রসারণ নিয়েও বাংলাদেশের আলোচনা চলছে। এসব দেশের ক্ষেত্রে নতুন কর্মী নিয়োগের অনুমতি, ভিসা কার্যক্রমের পরিধি এবং কোন পেশায় কর্মী নেওয়া হবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রয়োজন। আলোচনা চলা বা শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার অর্থ সব ধরনের কর্মীর জন্য নতুন নিয়োগ চালু হয়ে যাওয়া নয়।

সামগ্রিকভাবে, বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগে মালয়েশিয়া ও জাপানের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। মালয়েশিয়ায় নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সীমিতসংখ্যক কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতির কথা জানানো হয়েছে। জাপানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যেখানে ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে নিয়োগ শুরুর কথা রয়েছে।

থাইল্যান্ডসহ অন্য কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে আলোচনা ও চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এসব উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে; তবে বাস্তবে কতজন কর্মী যেতে পারবেন, কত খরচ হবে এবং কী শর্তে কাজ করবেন, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত চুক্তি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও বাস্তবায়নের ওপর। সূত্র: নবোদয়

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৯ অক্টোবর ২০২৬