বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করছেন। বর্তমানে নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে বিবেচিত এই জনগোষ্ঠী আয় কমে যাওয়া কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়লে দরিদ্র শ্রেণিতে নেমে যেতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে এই সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। এর মধ্যে গত এক বছরেই নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটির বেশি বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। মোট দারিদ্র্যের হার বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ১০ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে।

এর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ কয়েক দশকের ধারাবাহিক অগ্রগতির পর দারিদ্র্য পরিস্থিতি আবার উল্টো পথে হাঁটছে। সত্তরের দশকে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র থাকলেও পাঁচ দশকের মধ্যে সেই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে ছয়টি বড় চাপ উঠে এসেছে। এগুলো হলো করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, জ্বালানিসংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর ও ভর্তুকি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। মহামারির সময় বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুল মানুষ চাকরি হারান। তাঁদের একটি অংশ পরে আর আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে ফিরতে পারেননি।

বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণপ্রবাহের সংকোচন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তুলেছে। এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও এই চাপের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

দ্রারিদ্রসীমার নিচে বসবাস কোটি কোটি বাংলাদেশে ...
টানা চার বছরের বেশি সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নেমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হলেও তা এখনো সহনীয় পর্যায়ের ওপরে। একই সময়ে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বাসাভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছে; কেউ কেউ জমি ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করতেও বাধ্য হচ্ছে।

রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। দেশের রাজস্ব আয় জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। দুর্বল কর প্রশাসন ও কর পরিপালনের নিম্নহার সরকারের সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর সক্ষমতা সীমিত করছে। করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করা, কার্যক্রম ডিজিটাল করা এবং করদাতাদের সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরির পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

দরিদ্রদের সুরক্ষায় চালু কর্মসূচিগুলোর সুবিধা বণ্টনেও বড় অসংগতি পেয়েছে বিশ্বব্যাংক। দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন। নিচের দিকের ২০ শতাংশ মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা সহায়তা পেলেও সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা পাচ্ছেন ১০ হাজার ৪৭২ টাকা। বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশও যাচ্ছে ওপরের ২০ শতাংশ ধনীর কাছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, ফ্যামিলি কার্ডসহ নগদ ও খাদ্য সহায়তার কর্মসূচি সঠিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। বিদ্যমান পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ড বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলতে পারে। প্রকৃত দরিদ্রদের শনাক্ত করে সুবিধা পৌঁছানো গেলে সংখ্যাটি ২৮ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত হতে পারে।

সরকার বলছে, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট ও বিনিয়োগের দুর্বলতার একটি বড় অংশ আগে থেকেই ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নে কাজ চলছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক সুরক্ষার অপচয় বন্ধ করা না গেলে ঝুঁকিতে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যে পতনের হাত থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে।