সুশৃঙ্খল ও আদর্শিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে এবার তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আমির মাওলানা মোবারক হোসাইন। জমি দখল, প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়, আর্থিক অনিয়ম এবং দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রসহ তার বিরুদ্ধে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। এসব ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি খোদ দলের ভেতরেও চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
দখলদারিত্ব ও আর্থিক কেলেঙ্কারি
জেলা আমিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে শহরের মসজিদ রোডের ঐতিহ্যবাহী চেম্বার অব কমার্স ভবন এবং এর আশপাশের জমি দখল ঘিরে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে আদালতের রায় নিজেদের অনুকূলে নেন। এরপর মাত্র ১০ মিনিটের নামমাত্র নোটিশে ঐতিহ্যবাহী চেম্বার ভবনসহ প্রায় ৩০টি দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে পথে বসেন বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
অভিযোগ রয়েছে, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে বিনা পুঁজিতে শতকোটি টাকার সম্পত্তির বড় অংশের মালিকানা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে জেলা জামে মসজিদের পাশেই বিল্ডিং কোড না মেনে একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। নির্মাণাধীন এই ভবনের কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার জয়নাল এক অডিও বার্তায় নিশ্চিত করেছেন যে, ওই ভবনের ফ্ল্যাট বা দোকান বিক্রির সঙ্গে জেলা আমির সরাসরি সম্পৃক্ত।
এছাড়া মসজিদ রোডের ‘তিতাস টাওয়ার’ নির্মাণ ঘিরেও তার বিরুদ্ধে আর্থিক অস্বচ্ছতার প্রমাণ মিলেছে। চার বছর আগে টাওয়ারের নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত তিনি অংশীদারদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বুঝিয়ে দেননি। এই প্রতারণার শিকার হয়ে ভুক্তভোগীরা এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় জামায়াতের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও নির্বাচনী ষড়যন্ত্র
জামায়াতের মতো সুশৃঙ্খল দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও বিগত নির্বাচনগুলোতে তার ভূমিকা ছিল চরম বিতর্কিত ও দলীয় স্বার্থের পরিপন্থী। প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও অডিও রেকর্ড এসব তথ্য মিলেছে।
বিগত জাতীয় নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে হাতপাখার প্রার্থী হাফেজ মাওলানা নেছার আহমেদকে ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের জন্য নির্দেশ দেন মোবারক হোসাইন। এছাড়া, দলীয় জোটের প্রার্থী আশরাফ মেহেদীকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করে উল্টো দলীয় নেতা-কর্মীদের বিএনপির রুমিন ফারহানাকে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে নিজ দলের প্রার্থী জুনায়েদ হাসানের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য এনসিপির প্রার্থী আতাউল্লাহকে উৎসাহমূলক পরামর্শ দেন জেলা আমির। আতাউল্লাহর নিজের স্বীকারোক্তি এবং সংগঠনের স্থানীয় জনশক্তিদের সাক্ষ্য থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত ও কর্মীদের ক্ষোভ
সংগঠনের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, বিগত ১৫ বছরের বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা যখন প্রতিনিয়ত হামলা, মামলা ও কারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তখন জেলা আমির মোবারক হোসাইন প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিশ্চিন্তে ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগ করেছেন। তাকে বড় ধরনের কোনো আইনি হয়রানির মুখে পড়তে হয়নি। উল্টো দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত অসৌজন্যমূলক আচরণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একের পর এক এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত জেলা আমির মাওলানা মোবারক হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ন্যায়বিচারের স্বার্থে অবিলম্বে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্ত জেলা আমিরের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন দলের তৃণমূল নেতাকর্মী ও ভুক্তভোগীরা। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৩ নভেম্বর ২০২৬