দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড এবং সর্বোচ্চ সুরক্ষিত কেপিআই (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) জোন চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে জাদুমন্ত্রের মতো উধাও হয়ে যাচ্ছে আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার। কাস্টমসের সিস্টেমে 'লক' থাকা কনটেইনার থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকার রপ্তানিমুখী পণ্য—সবই গায়েব হচ্ছে নিমিষে।
এসব কনটেইনারে কী ছিল, কারা এনেছিল এবং কোথায় যাচ্ছে—তার কোনো হদিস না থাকায় এটি নিছক রাজস্ব ফাঁকি নাকি ভয়াবহ কোনো মানিলন্ডারিং বা জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি, তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
২৫০ কনটেইনারের ধোঁয়াশা কাটেনি এখনো
সম্প্রতি কাস্টমসের এসাইকোডা সিস্টেমে ডেলিভারি নিষিদ্ধ (২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত) ২৫০টি কনটেইনার গায়েবের খবর চাঞ্চল্য তৈরি করে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বারবার চিঠি দিলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ শুরুতে নীরব ছিল। পরে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বন্দর থেকে চিঠি ও বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করা হয়—কনটেইনারগুলো বিভিন্ন ইয়ার্ডেই রয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষ চিঠিতে কনটেইনারগুলো থাকার কথা জানালেও, হাজার হাজার কনটেইনারের ভিড়ে সুনির্দিষ্টভাবে সেগুলো কোথায় আছে, তা চিহ্নিত করেনি। ফলে কাস্টমসের কাছে একটি কাগুজে চিঠি ছাড়া কনটেইনারগুলোর বাস্তব অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ এখনো নেই।
৩ কোটি টাকার চালান উধাওয়ের অভিনব ছক
২৫০ কনটেইনারের রেশ কাটতে না কাটতেই তিন কোটি টাকা মূল্যের শতভাগ রপ্তানিমুখী কাপড়ের একটি ৪০ ফুটের কনটেইনার (নম্বর: MRSU-8692827) ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বের করে নেওয়ার ঘটনা সামনে আসে। ফ্রান্সের এক বায়ারের অর্ডারে ঢাকার গোল্ড স্টার গার্মেন্টস লিমিটেড এটি আমদানি করেছিল। এমভি এমসিসি দানাং (MV MCC Danang) জাহাজে আসা কনটেইনারটি এনসিটি টার্মিনাল হয়ে সিসিটি ইয়ার্ডে রাখা হয়।

নিলামেও প্রতারণা, এক বছরে গায়েব ৫ কনটেইনার
বন্দরের এই অরক্ষিত দশা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ছয় মাসের মধ্যেই প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের দুটি কনটেইনার গায়েব হয়। এক ক্রেতা কাস্টমসের নিলামে ২৭ টন কাপড় কিনতে ৮৫ লাখ টাকা এবং শুল্ক-ভ্যাট বাবদ আরও ২২ লাখ টাকা পরিশোধ করে ইয়ার্ডে গিয়ে দেখেন কনটেইনার নেই। আরেক ক্রেতা ৪২ লাখ টাকা দিয়েও পণ্য পাননি। বন্দরের নিজস্ব হিসাব মতেই, গত এক বছরে ইয়ার্ড থেকে ৫টি কনটেইনার উধাও হয়েছে।
ভেতরের লোক ছাড়া অসম্ভব: পুলিশ ও সাবেক কর্মকর্তা
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) বন্দর জোনের ডিসি আমিরুল ইসলাম জানান, বন্দর একটি কেপিআই জোন হওয়ায় পুলিশের অবাধ প্রবেশাধিকার নেই। নিজস্ব তদন্ত শেষে বন্দর পুলিশকে জানালে অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়, যা উদ্ঘাটন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। তবে তিনি স্পষ্ট জানান, "বন্দরের এতগুলো ধাপ পেরিয়ে একটি কনটেইনার বের করা ভেতরের লোকের সম্পৃক্ততা ছাড়া একেবারেই অসম্ভব।"
জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত
আবুল খায়ের গ্রুপের সিইও এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শহীদ উল্লাহ চৌধুরী এই ঘটনাগুলোকে দেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, "অতীতের ১০ ট্রাক অস্ত্র বা কোকেনের বৃহৎ চালান এই বন্দর দিয়েই এসেছে।
গায়েব হওয়া কনটেইনারগুলোর বেশিরভাগেরই আইজিএম (ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট) আছে, কিন্তু বিল অব এন্ট্রি নেই। অর্থাৎ, যারা আনছে, তারাই কৌশলে বের করে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অবৈধ চালানের মাত্র ২০ শতাংশ ধরা পড়ে। সরকারের কাছে গায়েব হওয়া কনটেইনারের ভেতরের পণ্যের কোনো তথ্য না থাকাটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় এলার্মিং।"
কী বলছে বন্দর কর্তৃপক্ষ?
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ও সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম দাবি করেন, "২৫০ কনটেইনারের সন্ধান দিয়ে কাস্টমসকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা না পাওয়ার বিষয়ে আর কিছু জানায়নি, তাই আমরা ধরে নিচ্ছি কনটেইনারগুলো সংরক্ষিত আছে।
এছাড়া হারিয়ে যাওয়া ৫টি কনটেইনার উদ্ধারে কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাদের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।"
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬