➤ রূপসী বাংলা আইপিটিভির নেত্রকোনা প্রতিনিধি লুৎফুজ্জামান আলিফকে গুলি করে হত্যার আগেও তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল। রাজধানীতে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকের বাড়িতে গুলি চালানোও হয়েছে।
এসব ঝুঁকির পাশাপাশি রয়েছে বকেয়া বেতন, আকস্মিক ছাঁটাই এবং চাকরি শেষে পাওনা না পাওয়ার অভিযোগ। সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালন, ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এসব ঘটনা।
সোমবার (২ নভেম্বর) সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারহীনতা অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস। ইউনেসকোর হিসাবে, বিশ্বজুড়ে ২০০৬ সাল থেকে নথিভুক্ত সাংবাদিক হত্যার ৮৬ শতাংশের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিহত হয়েছেন ১৮৯ জন; তাঁদের ৬৭ শতাংশ নিহত হয়েছেন সংঘাতপূর্ণ এলাকায়।
গত ১৫ অক্টোবর নেত্রকোনার দুর্গাপুরে বাজারে আলিফকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিজের ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পাতায়ও অপরাধ ও অনিয়মের অনুসন্ধান প্রকাশ করতেন তিনি। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বরও তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।
আলিফ হত্যা মামলায় গতকাল রবিবার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমেদের ভাষ্য, সীমান্তের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া ও পুলিশকে তথ্য দেওয়ায় আলিফের প্রতি আসামিদের ক্ষোভ ছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর খুলনার আড়ংঘাটার শলুয়া বাজারে চায়ের দোকানে গুলি করে হত্যা করা হয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম বর্তমান সময়ের সাংবাদিক এমদাদুল হক মিলনকে। চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ভোররাতে ঢাকার পল্লবীতে টেলিভিশন সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বাসায় গুলি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধী চক্র নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে হামলাটি হয়।

নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, অনলাইন হয়রানি এবং ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হুমকি পরিস্থিতি জটিল করছে বলে জানিয়েছে ইউনেসকো। সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে হামলার ধরনও বদলাচ্ছে। তাই সুরক্ষার ব্যবস্থায় ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং নারী সাংবাদিকদের বিশেষ ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি আছে আর্থিক অনিরাপত্তার বিষয়টি। গত ২৫ মে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন যৌথ বিবৃতিতে অভিযোগ করেছিল, বেতন-বোনাস ও প্রাপ্য সুবিধা পরিশোধ ছাড়াই অর্ধশতাধিক সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জনকণ্ঠ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ চাকরিচ্যুত করে। সংগঠন দুটি বকেয়া পরিশোধ এবং চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার অথবা আলোচনায় সমাধানের দাবি জানায়।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন গত ১৯ মে বলেন, অনেক সাংবাদিক ১৫ থেকে ২০ বছর কাজ করেও সার্ভিস বেনিফিট বা ভবিষ্য তহবিলের সুবিধা পান না। ২৫ জুলাই সংগঠনের আরেক সভায় তিনি গণমাধ্যমের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া এবং সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও গত ১৬ জুলাই বলেছেন, সাংবাদিকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর না হলে পেশাদার সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সম্মানজনক বেতন, চাকরির স্থায়িত্ব এবং নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর দাবিও উঠেছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাম্প্রতিক মতবিনিময় সভায়।
ইউনেসকোর ঢাকা কার্যালয় জানিয়েছে, ‘ব্যালট’ প্রকল্পে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার সাংবাদিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। নির্বাচন সামনে রেখে সুরক্ষা ভেস্ট ও নির্দেশিকাও দেওয়া হয়েছে। তবে সংস্থাটির বক্তব্য, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি হামলা প্রতিরোধ, হুমকিতে দ্রুত সাড়া এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা জরুরি।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের নিরাপত্তা নির্দেশনায় সাংবাদিক ও সম্পাদকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, বিমা এবং মানসিক সহায়তা পাওয়ার প্রয়োজন তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বিপদ এড়ানোর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক এই সংগঠন।
আলিফ হত্যার পর বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনা ও সংগঠনগুলোর দাবিতে তাই পুলিশের দ্রুত ব্যবস্থা, পরিবারের সুরক্ষা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং নিয়মিত বেতন ও প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজন একসঙ্গে উঠে আসছে। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০২ নভেম্বর ২০২৬