অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং বিনিয়োগের আস্থা ফিরছে, এমন আশাবাদ জানাচ্ছে সরকার। সামনে রয়েছে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, ব্যাংক খাতের নৈরাজ্য এবং বিনিয়োগের সংকট অব্যাহত থাকার চিত্র এসেছে। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে উন্নতি থাকলেও উৎপাদন, ঋণ ও কর্মসংস্থানে তার সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও একই হারের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সংকট, ব্যাংকের দুর্বলতা ও কম রাজস্ব বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে। একই দিনের আঞ্চলিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমার পর প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখনও ঘটেনি।

এর দুই দিন আগে, ৪ অক্টোবর বিশ্ব বিনিয়োগ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারকে সংকট থেকে তুলে আনার কথা বলেন। তিনি বন্ড ও শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনাও জানান। ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন বাড়ানোর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিনিয়োগকারীর আস্থা ও কার্যকর বাজার প্রয়োজন।


একই অনুষ্ঠানে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের কথাও বলা হয়। এটি ভবিষ্যতে ডলারে অর্থনীতির মোট আকারের লক্ষ্য, আর বিশ্বব্যাংকের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হলো মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দিয়ে বার্ষিক উৎপাদন বৃদ্ধির হার। দুটি সূচক সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। তবে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের বর্তমান দুর্বলতা ওই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে।

এই পথের বড় বাধা অর্থায়ন। বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ অনুযায়ী, জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন। শিল্পের প্রবৃদ্ধিও মাত্র ২ শতাংশ। ফলে বিনিয়োগে উৎসাহ ফেরার সরকারি বক্তব্যের বাস্তব পরীক্ষা হবে, উদ্যোক্তারা কতটা নতুন অর্থায়ন পাচ্ছেন এবং সেই অর্থ উৎপাদন ও চাকরি বাড়াচ্ছে কি না।

ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও চাপে। বিশ্বব্যাংক বলছে, মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি এবং সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ঋণাত্মক। ব্যাংকের ক্ষতি সামলানোর সক্ষমতা ফেরানো ছাড়া অর্থায়ন বাড়ানো কঠিন। গত ২৪ জুন সংস্থার বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসমে বলেছিলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনে স্থিতিশীল আর্থিক খাত প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের চলতি প্রতিবেদনে দেশের আর্থিক খাতের এক ভঙ্গুরদশা ফুটে উঠেছে।
ব্যাংকের আমানতকারীদেরও আশ্বাস দিয়েছে সরকার। ৮ জুলাই সংসদে অর্থমন্ত্রী সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের গ্রাহকদের সুদসহ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ব্যাংকগুলো লোকসানে থাকায় সময় লাগবে বলেও জানান। সেই প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি যাচাইয়ে টাকা ফেরানোর হিসাবের পাশাপাশি ব্যাংকের ক্ষতি ও মূলধন ঘাটতি কমার তথ্যও প্রয়োজন।

ব্যাংকে আস্থা ফেরার দাবিও রয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, ‘ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকরা আস্থা ফিরে পাচ্ছেন।’ আমানত উত্তোলনের আবেদন করেও অনেকে টাকা না নেওয়াকে তিনি এর লক্ষণ হিসেবে দেখান। এই দাবি একটি ব্যাংকের গ্রাহক আচরণভিত্তিক; পুরো খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য বুঝতে অন্য সূচকও দেখতে হবে।

বিনিয়োগের আরেক বাধা জ্বালানি। বিশ্বব্যাংক বলছে, গ্যাসের ঘাটতি, সরবরাহ বিঘ্ন ও বাড়তি উৎপাদন ব্যয় শিল্পকে চাপে রেখেছে। বৈদেশিক খাতে অবশ্য কিছু ইতিবাচক ফল রয়েছে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ও রিজার্ভের উন্নতি চাপ কমিয়েছে বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে। 

অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি আগের বছরের ১০ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। তবে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি কমছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলনে জাতীয় উচ্চ দারিদ্র্যসীমায় দরিদ্রের হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। তাই সামষ্টিক স্থিতিশীলতার কিছু অগ্রগতি পরিবারগুলোর স্বস্তিতে পুরোপুরি রূপ নেয়নি।

২৩ সেপ্টেম্বর গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকেও জানানো হয়, মূল্যস্ফীতি চলতি অর্থবছরে সরকারের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। অর্থাৎ মূল্যচাপ নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে মিল আছে। অমিলটি বেশি দৃশ্যমান পুনরুদ্ধারের গতি নিয়ে। আস্থা ফেরার বক্তব্যের পাশাপাশি ঋণ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ফল এখনও দুর্বল।

ব্যাংক পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণের সমাধান, রাজস্ব বাড়ানো ও জ্বালানি সরবরাহে দ্রুত সংস্কারের দিকে সুপারিশ বিশ্বব্যাংকের। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবে কতটা এগোচ্ছে, তার মাপকাঠি হবে এসব সংস্কারের ফল। ব্যবসায় অর্থায়ন, কারখানায় উৎপাদন এবং মানুষের আয় বাড়লে ঘুরে দাঁড়ানোর আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির মিল স্পষ্ট হবে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬