চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের মোট ভর্তুকি ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রতি মাসে গড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
এতে প্রথম তিন মাসেই সংস্থাটির তহবিল ঘাটতি ১৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আসন্ন সেচ মৌসুম ও পরবর্তী গ্রীষ্মকালীন চাহিদার সময়ে এই সংকট আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
বাজেট বরাদ্দ ও লোকসানের বাস্তব চিত্র
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি হিসেবে মোট ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল সরকার। সে অনুযায়ী অর্থ বিভাগ প্রথম তিন মাসে গড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা করে মোট ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে।
তবে সংস্থাটির লোকসান ও তহবিল ঘাটতির যে গতি, তাতে বছর শেষে ভর্তুকির পরিমাণ বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের চেয়ে অন্তত ১৪ হাজার কোটি টাকা বেশি হতে পারে বলে বিপিডিবির হিসাব শাখা নিশ্চিত করেছে।
উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির ভার বছর বছর লাফিয়ে বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে ভর্তুকি ছিল ৭,৪৩১ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২,৮০০ কোটি টাকায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ২৯,৫১১ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৯,৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ ভর্তুকি রেকর্ড ৬২ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছিল, যা আগের অর্থবছরে কিছুটা কমে ৪৩,১০০ কোটি টাকা করা সম্ভব হয়েছিল।
মূল কারণ: গ্যাস সংকট ও ফার্নেস অয়েলের ঊর্ধ্বমুখী দামবিপিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পেরে তেলচালিত (বিশেষ করে ফার্নেস অয়েল) কেন্দ্রগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ৭০ টাকা ১০ পয়সা, যা মে মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৩ টাকা ৫৪ পয়সায়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ফার্নেস অয়েলের লিটারপ্রতি দাম ছিল ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সা। অতিরিক্ত খরচের কারণে বিপিডিবির উৎপাদন ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উৎপাদন খরচের ব্যবধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপিডিবির গত ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৪,৮৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয়েছিল প্রায় ৪২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। অথচ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৪,১৯৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা—যা গ্যাসের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণেরও বেশি!
অর্থমূল্যের সমন্বয় ও গ্রাহক ভোগান্তি
ভর্তুকির চাপ সামলাতে গত জুন মাসে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর ফলে প্রতি ইউনিটের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে হয় ১০ টাকা ৬৩ পয়সা এবং পাইকারিতে ৭ টাকা থেকে বেড়ে হয় ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। বিইআরসির প্রাক্কলন ছিল, এতে বছরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমবে। কিন্তু তার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় সেই হিসাব পুরোপুরি ভণ্ডুল হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও বিপিডিবির বক্তব্য
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, "গ্যাস ঘাটতির ফলে বিগত কয়েক মাসে তেলচালিত বিদ্যাকেন্দ্র থেকে বেশি উৎপাদন করতে হয়েছে। পিক আওয়ারে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৪,৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে নিতে হচ্ছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল। এতে সামগ্রিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।"
অন্যদিকে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামছুল আলম এই অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে বলেন, "বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় বারবার বাড়ছে। দাম বাড়িয়ে গ্রাহকের ওপর বোঝা না চাপিয়ে কীভাবে সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ও ভর্তুকি কমানো যায়, সরকারকে সেই পথ বেছে নিতে হবে।"
বর্তমানে আমদানিসহ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯,৫৯৩ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৫৪টি কেন্দ্রের সক্ষমতা ৫,৬৪১ মেগাওয়াট। কিন্তু সমন্বিত জ্বালানি নীতির অভাব ও সাশ্রয়ী প্রাথমিক জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় অর্থখাত এখন অভূতপূর্ব ভর্তুকির চাপে পড়তে যাচ্ছে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১১ অক্টোবর ২০২৬