➤ শিক্ষার ব্যয়ভার ও শিশুশ্রমের থাবা: সাধারণ মাধ্যমিক ছেড়ে মাদ্রাসা ও কর্মমুখী হচ্ছে শিক্ষার্থীরা
➤ মাধ্যমিকে উদ্বেগজনক চিত্র: ১৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী উধাও, ঝুঁকছে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে
➤ দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও উদ্বেগজনক হারে কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। গত সাত বছরে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ১৭ লাখ ৮৩ হাজার (২০ দশমিক ১ শতাংশ)। সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ার খরচ তুলনামূলক কম হলেও সেখানেও একই চিত্র।
বিপরীতে, সাধারণ শিক্ষা ছেড়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী আলিয়া মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার এই উদ্বেগজনক বাঁক বদলের চিত্র উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যানে শিক্ষার্থী কমার চিত্র
ব্যানবেইসের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (ষষ্ঠ-দশম শ্রেণি) মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৮৮ লাখ ৫৭ হাজার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ ৭৪ হাজারে। অথচ এই একই সময়ে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬ হাজার ১৮৬টি থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৭৩৭টিতে উন্নীত হয়েছে।
দেশের ৯৭ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বেসরকারি হলেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি বিদ্যালয়ের কদর বেশি। কিন্তু সেখানেও শিক্ষার্থী ধরে রাখা যাচ্ছে না। ২০১৮ সালে সরকারি মাধ্যমিকে ছেলে শিক্ষার্থী ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজারে (কমেছে ২৭.৪%)। একইভাবে, মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার থেকে কমে ২ লাখ ২৫ হাজারে (কমেছে ১৪.৮%) নেমে এসেছে।
ঝোঁক বাড়ছে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে
সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে যখন শিক্ষার্থীর আকাল, তখন নিবন্ধিত আলিয়া মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১৮ সালে আলিয়া মাদ্রাসায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৩ লাখ ৬২ হাজার, যা ২০২৫ সালে ১০ দশমিক ১ শতাংশ (৩৬,৬৬০ জন) বেড়ে ৩ লাখ ৯৮ হাজার হয়েছে।
একইভাবে ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষার্থী বেড়েছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ (২২,৫৫৪ জন থেকে বেড়ে ২৪,৫৩০ জন)। যদিও কর্তৃপক্ষের মতে, অনেক স্কুল নিবন্ধনের বাইরে থাকায় ইংরেজি মাধ্যমের প্রকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বেশি।
সাধারণ স্কুল ছেড়ে যাওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর গন্তব্য নিয়ে ব্যানবেইসের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে গত ১৪ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন সংসদে জানিয়েছিলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
নেপথ্যের কারণ: শিক্ষার ব্যয়ভার ও শিশুশ্রম
শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ হলো শিক্ষার অদৃশ্য ব্যয় ও দারিদ্র্য। ইউনেস্কোর ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষার মোট ব্যয়ের ৭১ শতাংশ পরিবারগুলোকে বহন করতে হয়। এছাড়া গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে প্রাথমিক শিক্ষায় পারিবারিক ব্যয় ২৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৫১ শতাংশ বেড়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, সাধারণ বিদ্যালয়ে বেতনের বাইরে প্রাইভেট কোচিং ও গাইডবইয়ের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এই ব্যয় মেটাতে না পেরে অনেক পরিবার সন্তানদের অপেক্ষাকৃত কম খরচের মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছে।
পরিবারের চরম আর্থিক সংকটের কারণে শিশুশ্রমও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের তথ্য বলছে, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত থাকার হার ২০১৯ সালের ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে গেলে শিশুশ্রম বাড়বেই। পাশাপাশি মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ ও নিরাপত্তার অভাব তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার বড় কারণ।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও উদ্যোগ
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। অনেক অভিভাবকের ধারণা, বিনা মূল্যে পড়ানো হলেও সরকারি স্কুলে মানসম্মত শিক্ষা মেলে না।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দীন আল মাহমুদ সোহেল জানান, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমার বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কোভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম বৃদ্ধি এবং বিকল্প শিক্ষায় স্থানান্তরের মতো বিষয়গুলো তদন্ত করে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়ানো ও ধরে রাখার উপায় বের করা হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে সরকার বৃত্তিমূলক ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার প্রসারেও গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ ২৬ অক্টোবর ২০২৬