আজ ১১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন, কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিতে বিনিয়োগ করুন’। বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটি ২০ লাখের বেশি কন্যাশিশুর বাল্যবিবাহ হয়। অর্থাৎ প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে জীবিত প্রায় ৬৫ কোটি নারী ও কন্যাশিশুর বাল্যবিবাহ হয়েছে। ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হওয়া কন্যাশিশুর হার প্রায় পাঁচজনে একজন।
১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে গৃহীত বেইজিং ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনায় কন্যাশিশুর অধিকার বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। পরে ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ঘোষণা করে। বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের জন্য বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরিই দিবসটির মূল লক্ষ্য।
অনিরাপদ শৈশব
ঘরে-বাইরে কোথাও যেন নিরাপদ নয় কন্যাসন্তানের শৈশব। সহিংসতা ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে দিন দিন চরম নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠছে দেশের কন্যাশিশুরা। জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল অ্যান্ড এক্সেস টু জাস্টিস উপ-পরিষদের আট মাসের (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
লোমহর্ষক যৌন সহিংসতা ও হত্যা
মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কন্যাশিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার চিত্র ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। আট মাসে ২৪০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৫৫ জন শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে ২২ জন শিশুকে, আর লোকলজ্জা ও মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ২ জন।
এছাড়া ১১২ জন শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৬০ জন, ইভটিজিংয়ের শিকার ৩৬ জন এবং সাইবার সহিংসতার মুখ পড়েছে ১৪ জন কন্যাশিশু। ইভটিজিংয়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে ৩ জন শিশু আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
যৌন সহিংসতার বাইরে সরাসরি ৯৩ জন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং ৪ ৪ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। নির্যাতনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ২৮ জন শিশু, আর আত্মহত্যায় প্ররোচনার শিকার হয়েছে ৫ জন। অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে অপহরণের শিকার হয়েছে ৪০ জন ও পাচার হয়েছে ৩২ জন শিশু।
এমনকি গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের ওপরও চলে অমানুসিক নির্যাতন; বাসাবাড়িতে কাজ করতে গিয়ে ৬ জন গৃহকর্মী শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং ৭ জনকে পিটিয়ে বা নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে ১৭টি বাল্যবিয়ে ঠেকানো গেলেও ২টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি।
মাসভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরের মে মাস থেকে কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে। জানুয়ারিতে ৭৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭৩ জন, মার্চে ৭১ জন এবং এপ্রিলে ৮৭ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হলেও মে মাসে একলাফে তা দাঁড়ায় ১৪৫ জনে। জুন মাসে বছরের সর্বোচ্চ ১৭৭ জন, জুলাইয়ে ১৩৮ জন এবং আগস্টে ১১৮ জন কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়।
কন্যাশিশুর ওপর এই ক্রমাগত নির্যাতনকে কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে দেখতে নারাজ বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এটি সমাজের গভীরে প্রোথিত দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকট এবং রাষ্ট্রের নীতিগত কাঠামোর দুর্বলতার প্রতিফলন।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘কন্যাশিশু নির্যাতন কোনো নির্দিষ্ট সরকারের আমলের বিষয় নয়; এটি সব সময়ই হয়ে আসছে। আমাদের সমাজে কন্যাসন্তান আজও বৈষম্যের শিকার। কন্যাসন্তানের জন্মকে এখনও পরিবারগুলো ছেলেশিশুর মতো সানন্দে গ্রহণ করতে পারে না।’ নারীদের ‘পণ্য’ হিসেবে দেখার মানসিকতা ও সামগ্রিক অবক্ষয় বন্ধ না হলে কন্যাশিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক নারী—কেউই রেহাই পাবে না বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন 'নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন'-এর অন্যতম মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী বলেন, ‘পাঁচ দশক আগেও কন্যাশিশু মানেই ছিল পরিবারের ওপর বাড়তি বোঝা। দুঃখজনকভাবে, আজও সমাজের শিক্ষিত বা প্রগতিশীল পরিবারগুলোতে এই মৌলিক চিন্তার পরিবর্তন হয়নি।’
প্রান্তিক পরিবারের সংকট ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দরিদ্র পরিবারগুলো সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপে পড়ে মেয়েদের বোঝা মনে করতে বাধ্য হয়, কিন্তু এর মূল দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র আজও কন্যাশিশুর সুরক্ষা, শিক্ষা ও পুষ্টির কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। রাষ্ট্রের নীতিতে কন্যাশিশুর উন্নয়ন এখনো কেবল "টোকেনিজম" বা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।’
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১১ অক্টোবর ২০২৬