• শাহবাগ: ঠিকানাহীন মানুষের শেষ গন্তব্য, ৯ মাসে উদ্ধার ৬৫ অজ্ঞাত মরদেহ
  • পরিচয়হীন লাশের সারি: রাজধানীতে ভাসমান মানুষের নীরব মৃত্যু ও পরিসংখ্যানের আড়াল
  • বেওয়ারিশ জীবনের করুণ পরিণতি: বছরে দাফন হচ্ছে ৫৭৭ অজ্ঞাত মরদেহ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে পড়ে থাকা এক নিথর দেহ। ৬ অক্টোবর বিকেলের এই দৃশ্যে পথচারীদের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। ডান পায়ের গোড়ালিতে ব্যান্ডেজ বাঁধা আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী লোকটির পরিচয় বা ঠিকানা কেউ জানে না। একই দিন সকালে ও দুপুরে ওই স্থান ও এর আশপাশ থেকে উদ্ধার করা হয় আরও দুটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ ও এর আশপাশের এলাকাগুলো এখন ভাসমান ও ঠিকানাহীন মানুষের এক বিশাল আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। আর মৃত্যুর পর এই এলাকাটিই হয়ে উঠছে পরিচয়হীন লাশের সবচেয়ে বড় উৎস।

শাহবাগে কেন এত ভাসমান মানুষ? 

ঢাকা মেডিকেল, জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট, চাঁনখাঁরপুল, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মাজার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি মূলত ভাসমান মানুষের কাছে তুলনামূলক নিরাপদ। এখানে পুলিশের কড়াকড়ি কম। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বিনামূল্যের খাবার। 

হাইকোর্টের শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির (রহ.) মাজারের পক্ষ থেকে প্রতিদিন দুপুরে ও সন্ধ্যায় অন্তত ৫০০ মানুষের খাবার রান্না করা হয়। এছাড়া ঢামেক এলাকার অস্থায়ী দোকান ও আনন্দ বাজার থেকেও ভবঘুরেরা খাবার সংগ্রহ করেন। কাজের সন্ধানে বা নিঃস্ব হয়ে কমলাপুর, পুরান ঢাকা বা সদরঘাট থেকে আসা বহু মানুষ এই নিশ্চিন্ত খাবারের খোঁজে শাহবাগে আস্তানা গাড়েন।

অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্ত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে ...
অজ্ঞাত লাশের পরিসংখ্যান: শাহবাগ শীর্ষে 

পুলিশের তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের ক্ষেত্রে ঢাকার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রমনা বিভাগ, বিশেষ করে শাহবাগ থানা এলাকা।

  • শাহবাগের চিত্র: চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে শাহবাগ ও ঢামেক এলাকা থেকে ৭৯টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৪ জনের পরিচয় মিলেছে, বাকি ৬৫ জনই বেওয়ারিশ। আগের বছর ২০২৫ সালে উদ্ধার হওয়া ৮১টি মরদেহের মধ্যে পরিচয়হীন ছিলেন ৬৮ জন। অর্থাৎ, গত ২১ মাসে উদ্ধার হওয়া ১৬০টি মরদেহের মধ্যে ৮৩ শতাংশেরই (১৩৩ জন) কোনো পরিচয় মেলেনি।
  • ডিএমপির চিত্র: ২০২৫ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আটটি বিভাগে মোট ২১৪টি অজ্ঞাত মরদেহ পাওয়া যায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৮১টি ছিল রমনা বিভাগে। এছাড়া তেজগাঁওয়ে ৫১, ওয়ারীতে ২১, লালবাগে ১৭, মতিঝিলে ১৭, মিরপুরে ১২, উত্তরায় ৯ এবং গুলশানে ৬টি মরদেহ উদ্ধার হয়। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ৭৬টি অজ্ঞাত মরদেহের মধ্যেও সর্বোচ্চ ৩১টি রমনা বিভাগের।

মৃত্যুর কারণ ও ময়নাতদন্তের চিত্র 

ঢামেকের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের তথ্যমতে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পৌনে ছয় বছরে ১ হাজার ৬৯০টি অজ্ঞাত মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই ময়নাতদন্ত হয়েছে ৩৮৪টির। বছরে গড়ে ২৯২টি বেওয়ারিশ মরদেহের ময়নাতদন্ত করছে বিভাগটি।

চিকিৎসক ও পুলিশের মতে, এসব মানুষের বেশিরভাগের বয়স ৪০-এর ওপরে। মূলত পুষ্টিহীনতা, মাদকাসক্তি, দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকা এবং বার্ধক্যজনিত জটিলতায় তারা মারা যান। 

ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. মমতাজ আরা জানান, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়া এসব ভাসমান মানুষের অনেকেই ‘সেপটিক শক’-এ আক্রান্ত ছিলেন, যেখানে ধীরে ধীরে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটে।

বেওয়ারিশ লাশের সারি দিনদিন বড় হচ্ছে ...
পরিচয় শনাক্তের লড়াই ও বেওয়ারিশ দাফন 

উদ্ধারের পর পুলিশের প্রথম কাজ থাকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম জানান, এদের বেশিরভাগেরই কখনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) করা হয়নি, তাই আঙুলের ছাপেও তাদের চেনা যায় না। 

অনেক সময় পচে যাওয়ার কারণে বায়োমেট্রিক তথ্যও নেওয়া যায় না। কয়েক দিন চেষ্টার পর ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করে মরদেহ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য বলছে, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে মোট ২ হাজার ১৬৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ রায়েরবাজার ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। বছরে গড়ে প্রায় ৫৭৭টি ঠিকানাহীন মানুষ এভাবে মাটির নিচে হারিয়ে যাচ্ছেন চিরতরে।

ভাসমান এসব মানুষের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, "পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন বা মানসিকভাবে অসুস্থ এসব মানুষের একটি সরকারি তালিকা বা ডেটাবেজ থাকা জরুরি। 

এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ যেমন সহজ হবে, তেমনি মৃত্যুর পর তাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াটাও সম্ভব হবে। এটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব।" 

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১০ অক্টোবর ২০২৬