অপরাধের সাতকাহনে টালমাটাল দেশ

  • উদ্বেগজনক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: খুন, ডাকাতি ও মব সন্ত্রাসের ভীতিকর পরিসংখ্যানে ঝুঁকিতে খোদ পুলিশও
  • নারী নির্যাতন থেকে মব জাস্টিস—৯ মাসের অপরাধচিত্রে শঙ্কা, ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

➤ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে তীব্র অস্বস্তি ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ এবং মব সন্ত্রাসের মতো ঘটনাগুলোর লাগামহীন বৃদ্ধি সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও ভাবিয়ে তুলেছে। 

অপরাধীদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে, খোদ থানা কম্পাউন্ডের ভেতরেই পুলিশ সদস্যদের মবের শিকার হতে হচ্ছে। এসব অপরাধ ঠেকাতে না পারলে দেশের আইনশৃঙ্খলা ভয়াবহ পরিণতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

পরিসংখ্যানে অপরাধের ভয়াবহ চিত্র 

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধে মোট ৭৯ হাজার ৫৭০টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ এবং পুলিশের ওপর হামলার মতো সুনির্দিষ্ট ছয়টি ভয়ংকর অপরাধেই মামলা হয়েছে ২২ হাজার ৩৩৯টি।

  • প্রতিদিন ১০টি খুন: গত ৯ মাসে সারা দেশে শুধু হত্যা মামলাই হয়েছে ২ হাজার ৬৫৬টি। মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়—জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৩, জুলাইয়ে ২৯৮, আগস্টে ২৮৬ এবং সেপ্টেম্বরে ২৯৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে ২৯৫টি এবং দিনে প্রায় ১০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। 
  • পরিসংখ্যানের বাইরেও সম্প্রতি খুলনায় গুলিতে যুবক ও গৃহবধূ নিহত, দিনাজপুরে ছুরিকাঘাতে মৃত্যু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে পুকুরে হাত-পা বাঁধা গৃহবধূর লাশ, শেরপুরে প্লাস্টিকের ড্রামে নারীর মরদেহ, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু এবং ভোলায় দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনাগুলো নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার স্পষ্ট প্রমাণ।
  • মব সন্ত্রাসে মৃত্যু ২৫৬: মানবাধিকার সংগঠন ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফোরাম’ (এমএসএফ)-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ১৩৪টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৮৬৮ জনের প্রাণহানি এবং ৮৬১ জন আহত হয়েছেন।
  •  এর মধ্যে কেবল চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩৭টি মবের ঘটনায় ২৫৬ জন নিহত এবং ৫৭৫ জন আহত হয়েছেন, যা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চরম বিপজ্জনক প্রবণতা নির্দেশ করে।
  • নারী নির্যাতন ও অপহরণ: সামাজিক নিরাপত্তার কঙ্কালসার দশা ফুটে উঠেছে নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যানে। ৯ মাসে এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১৬ হাজার ৭০৯টি। একই সময়ে অপহরণের মামলা হয়েছে ৭৬৯টি।
  • ডাকাতি ও ছিনতাই: প্রথম ৯ মাসে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১ হাজার ৭৬৩টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে (জানুয়ারি ২১৫, ফেব্রুয়ারি ১৭৬, মার্চ ১৮১, এপ্রিল ২০৩, মে ২০৯, জুন ১৮৯, জুলাই ১৬০, আগস্ট ১৯৬ এবং সেপ্টেম্বর ১৮১টি)। পুলিশের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডাকাতি ও দস্যুতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
  • রাজনৈতিক সহিংসতা: মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ৯ মাসে দেশে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৭৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৭৩ জনেরও বেশি মানুষ।
    অপরাধ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ...
    ঝুঁকিতে পুলিশ সদস্যরাও 

অপরাধীদের বেপরোয়া আচরণের শিকার হচ্ছেন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৪৪২টি মামলা হয়েছে, যেখানে আহত হয়েছেন ৪৪২ জন সদস্য। 

আগের বছর (২০২৫) এই সংখ্যা ছিল ৬০১ জন। বিশেষ করে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে এবং মব সহিংসতার কবলে পড়ে পুলিশ সদস্যরা গুরুতর আহত হচ্ছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্যও খসড়া প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ 

পুলিশের নিজস্ব তদন্ত ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অপরাধের নেপথ্যে মূলত মাদক, পূর্বশত্রুতা, আধিপত্য বিস্তার এবং পারিবারিক ও রাজনৈতিক বিরোধ কাজ করছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সতর্ক করে বলেন, "আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে না পারলে সরকারের সব ইতিবাচক কাজের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অস্ত্র, মাদক এবং চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্সের কোনো বিকল্প নেই।"

অন্যদিকে, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, অপরাধীর পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে প্রাধান্য দিয়ে আইন প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি কখনোই নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রোধে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ইতোমধ্যে মব সহিংসতা, মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। 

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিরলস কাজ করছে এবং কিশোর গ্যাং নির্মূলে প্রতিটি থানায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ◉ 

নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬