২০ মাসে নদীতে ৯২০ মরদেহ, অজ্ঞাত ২৬৭
বাংলাদেশের নদ-নদীতে মানুষের মৃত্যু নতুন ঘটনা নয়। নৌদুর্ঘটনা, নদীতে পড়ে যাওয়া, গোসল করতে গিয়ে ডুবে যাওয়া কিংবা আত্মহত্যার মতো নানা ঘটনায় নিয়মিত মরদেহ উদ্ধার হয়। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই মৃত্যুর আরেকটি দিক সামনে আনছে।
নৌ পুলিশের হিসাবে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট এই ২০ মাসে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ৯২০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৫৪১টি এবং চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৩৭৯টি। অর্থাৎ এই সময়ে গড়ে প্রতিমাসে ৪৬টির বেশি মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে।
এই ৯২০টি মরদেহের সবগুলো হত্যাকাণ্ডের শিকার এমন তথ্য নেই। নৌ পুলিশের হিসাবে, ২০২৫ সালে নদী থেকে উদ্ধার ৫৪১ মরদেহের ঘটনায় ৯০টি হত্যা মামলা এবং ৩৬৭টি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৭৯ মরদেহের ঘটনায় ৪৯টি হত্যা মামলা ও ২৭৬টি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। অর্থাৎ বড় একটি অংশ দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু ও অন্যান্য কারণে ঘটেছে। একই সময়ে নদীতে হত্যার পর মরদেহ ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, অনেক মরদেহের পরিচয়ই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ২০২৫ সালে উদ্ধার হওয়া ৫৪১ মরদেহের মধ্যে ৩৭৫টির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে, অজ্ঞাত রয়ে গেছে ১৬৬টি।
২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ৩৭৯ মরদেহের মধ্যে ২৭৮টির পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও ১০১টি এখনো অজ্ঞাত। সব মিলিয়ে ২০ মাসে ২৬৭টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
পরিচয়হীন মরদেহের এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নিখোঁজ মানুষের পরিবার, অসমাপ্ত তদন্ত এবং অপরাধ শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা। নদীতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরে, চেহারা ও আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পরিচয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। পরে পরিচয়হীন মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে হয়।
গত পাঁচ বছরের তথ্যেও একই চিত্র পাওয়া যায়। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নদী থেকে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৪২৫ জনের পরিচয় শনাক্ত হলেও ৬৩৯ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

কোনো ব্যক্তিকে অন্যত্র হত্যার পর নদীতে ফেলে দিলে মরদেহ ভেসে যেতে পারে দূরের কোনো জেলা বা নদী তীরবর্তী এলাকায়। এতে হত্যার স্থান, সময় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই কারণে নদীকে অপরাধের আলামত গোপনের তুলনামূলক সহজ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ফরেনসিক তদন্তেও পানি বড় বাধা তৈরি করে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে শরীরের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পচন বাড়ে এবং বিভিন্ন আলামত নষ্ট হতে পারে। ফলে শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও অনেক সময় তা শনাক্ত করা কঠিন হয়। পরিচয় নিশ্চিত করতে তখন পোশাক, শরীরের বিশেষ চিহ্ন, দাঁতের গঠন, আঙুলের ছাপ কিংবা ডিএনএর মতো বিকল্প প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হয়। শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি মরদেহের ক্ষেত্রেও পরিচয় শনাক্তে এমন বিকল্প প্রমাণ ব্যবহার করতে হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবেও ঢাকার আশপাশের নদীগুলোতে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বেশি। ২০২৫ সালে ঢাকা অঞ্চলে ১০১টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ৮৮, বরিশালে ৬৫, চট্টগ্রামে ৫৮ এবং রাজশাহীতে ৫৬টি মরদেহ উদ্ধার হয়।
২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেও ঢাকায় ৬৯টি, বরিশালে ৫২টি, ফরিদপুর ও রাজশাহীতে ৪৯টি করে এবং নারায়ণগঞ্জে ৪৭টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তবে বেশি মরদেহ উদ্ধার হওয়াকে সরাসরি বেশি হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না; জনসংখ্যা, নদীপথে মানুষের চলাচল ও নৌযানের সংখ্যাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
নদীতে মরদেহ ফেলার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, মাদক কারবার ও সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের মতো কারণ বিভিন্ন হত্যা মামলার তদন্তে সামনে এসেছে বলে নৌ পুলিশ জানিয়েছে। অর্থাৎ সব ঘটনা একই ধরনের অপরাধ নয়। কোথাও পরিকল্পিত হত্যার পর মরদেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কোথাও অপরাধের আলামত নষ্টের চেষ্টা করা হয়েছে, আবার কোথাও নিছক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এই পরিস্থিতিতে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাত মরদেহের তথ্যের সমন্বয়। কোনো ব্যক্তি এক জেলায় নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মরদেহ অন্য জেলার নদীতে পাওয়া গেলে দুই তথ্য দ্রুত একসঙ্গে না এলে পরিচয় শনাক্তে দীর্ঘ সময় লাগে। জাতীয় পর্যায়ে নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য, অজ্ঞাত মরদেহের ছবি, আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ তথ্য সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এই ব্যবধান কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সন্দেহজনক ঘটনায় শুধু উদ্ধারস্থল নয়, নদীর স্রোতের গতিপথ ধরে উজানের এলাকাতেও তদন্ত চালানো প্রয়োজন।
গত পাঁচ বছরে ২ হাজার ৬৪টি এবং মাত্র ২০ মাসে আরও ৯২০টি মরদেহ উদ্ধারের হিসাব দেখাচ্ছে, নদীতে মানুষের মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর বড় অংশ দুর্ঘটনা হলেও নদীকে ব্যবহার করে হত্যার পর মরদেহ গোপন করার ঘটনাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে শত শত অজ্ঞাত মরদেহ।
তাই নদী থেকে একটি লাশ উদ্ধার হওয়ার পর সেটিকে শুধু একটি উদ্ধারকাজ হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনা ধরা পড়ে না। প্রতিটি মরদেহের পরিচয়, মৃত্যুর কারণ এবং মৃত্যুর আগে-পরে কী ঘটেছিল—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে নদীর স্রোতের সঙ্গে অনেক মৃত্যুর সত্যও হারিয়ে যেতে পারে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬