- উদ্বেগজনক মব সহিংসতা: বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ থেকে পুলিশ
- ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধ পিটুনি: ৯ মাসেই ৫শ’র বেশি সহিংসতায় ২৩৫ জনের মৃত্যু
ঢাকা: রাত ১১টা। যশোরের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে কয়েকটি প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে একদল যুবক প্রবেশ করলে মাইকে ঘোষণা আসে— ‘ডাকাত এসেছে!’ ধাওয়া খেয়ে পালাতে গিয়ে মালপাড়ায় পাঁচজন জনতার হাতে ধরা পড়েন এবং দলবদ্ধ পিটুনির শিকার হন। পরে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
খুলনার একটি মেসে চুরির অপবাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আজমুলকে পিটিয়ে মারা বা পাবনায় ধর্ষণের অভিযোগে প্রধান আসামির বাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো এখন যেন নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুরির অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা নিছক গুজবের বশবর্তী হয়ে মুহূর্তের মধ্যে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে জনতা। বিচারহীনতার এই ভয়ংকর সংস্কৃতি বা ‘মব জাস্টিস’ সমাজকে দিন দিন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিসংখ্যানে মব সহিংসতার ভয়াবহতা
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৬১২টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৪৯ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৬৬৪ জন।
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ঘটে যাওয়া ৫০১টি সহিংসতায় ২৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৫৪০ জন। পরিসংখ্যান বলছে, আগস্ট মাসে সর্বোচ্চ ৩৫ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন আসক-এর তথ্যমতে, গত বছর (২০২৫) মব সহিংসতায় ১৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অথচ চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসেই ১৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৫৭ জন নিহত হয়েছেন।
হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশও
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসেই দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর ৪০০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬০১টি।
সদ্য বিদায়ী পুলিশ মুখপাত্র এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। তিনি বলেন, “অপরাধীর বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কাউকে অপরাধী মনে হলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। যারা আইন হাতে তুলে নেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী এই পরিস্থিতিকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি বলেন, “আইন যখন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানুষ আইনি প্রতিকারের বদলে নিজেরাই বিচার করতে শুরু করে, তখন সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। অপরাধের বিচার আদালতে হতে হবে, রাস্তায় নয়। মব সহিংসতা বন্ধে রাষ্ট্রকে দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”
মানবাধিকারকর্মী ও এমএসএফের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমানের মতে, সমাজে সহনশীলতার অভাব এবং বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতা এই সংকটের অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, “ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে সেখানে উপস্থিত হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুরক্ষা দিতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করার পাশাপাশি মবের হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। একটি ঘটনার বিচার যদি ১০ বছর পর হয়, তবে মানুষের আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়। তাই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।”
মব জাস্টিস বা দলবদ্ধ সহিংসতা নিছক কোনো অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ওপর এক গভীর আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। গুজব প্রতিরোধ, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার মাধ্যমেই কেবল এই ভয়ংকর ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব। অন্যথায়, আইনের শাসন এবং জননিরাপত্তা উভয়েই চরম হুমকির মুখে পড়বে।
নিউজ নাউ বাংলা/ জেডআরসি/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬