➤ চিকিৎসক-নার্স অনুপাতের অভাবে ধুঁকছে চিকিৎসাসেবা

  • ডব্লিউএইচও-এর মানদণ্ডের অনেক নিচে বাংলাদেশ: স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট ও সমন্বয়হীনতার চালচিত্র
  • রোগীর চাপে পিষ্ট হাসপাতাল: সংকট নিরসনে এক লাখ নতুন পদ সৃজনের উদ্যোগ সরকারের

➤ হাসপাতালে উপচে পড়া রোগীর ভিড়, চিকিৎসকদের হাতে সময় চরম সীমিত, আর নার্সদের সামলাতে হচ্ছে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বাড়তি চাপ। দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের এই রুগ্ন দশার মূল কারণ প্রকট জনবল সংকট এবং চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টদের চরম ভারসাম্যহীনতা। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ন্যূনতম ৪৪ দশমিক ৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন হলেও, বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ১৫ জন।

পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যতের শঙ্কা 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে যে হারে প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ চলছে, তাতে ২০৩০ সালেও প্রতি ১০ হাজারে স্বাস্থ্যকর্মী দাঁড়াবে ৩১ দশমিক ৭৭ জনে। অর্থাৎ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) বছরেও প্রতি ১০ হাজারে প্রায় ১৩ জন স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি থেকে যাবে।

ডেঙ্গু, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধির পাশাপাশি হাম ও যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপের কারণে স্বাস্থ্যকর্মীর এই ঘাটতি সেবাব্যবস্থাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে।

চিকিৎসক-নার্স ভারসাম্যহীনতা 

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স ও মিডওয়াইফারি (ধাত্রী) এবং ৫ জন অন্যান্য টেকনোলজিস্ট বা স্বাস্থ্যকর্মী থাকা অপরিহার্য। অথচ বাংলাদেশে ১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স ও মিডওয়াইফারির সংখ্যা ১ জনেরও কম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ২ জনেরও কম।

বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আসাদুজ্জামান জুয়েল জানান, সংকটের সময় বরাবরই শুধু চিকিৎসক নিয়োগে জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নার্স ও টেকনোলজিস্টদের অনুপাতের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত। বর্তমান সরকার ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নিলেও নার্স নিয়োগে তেমন জোরালো পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

রোগীর চাপ ও সেবার মান 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, "উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন চিকিৎসককে দিনে ১০০ থেকে ১৫০ জন বহির্বিভাগের রোগী দেখতে হয়। ফলে মাথাপিছু কয়েক মিনিটের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। 

আবার ২৪ শয্যার ওয়ার্ডে কখনো কখনো ৪৮ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন, যেখানে নার্সের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।" তিনি আরও বলেন, কেবল চিকিৎসক নিয়োগ দিলেই হবে না; চিকিৎসা সরঞ্জাম, শয্যা এবং সহায়ক কর্মীদের নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জনবলের বর্তমান চিত্র ও বিদ্যমান শূন্যপদ অবশ্য গত কয়েক বছরে জনবল কিছুটা বেড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘হিউম্যান রিসোর্সেস ফর হেলথ ডেটা শিট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সাল নাগাদ চিকিৎসকের সংখ্যা ৫১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ জনে (যার মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ১৯৪ জন কর্মক্ষেত্রে লভ্য)। নার্সের সংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১ লাখ ৭ হাজার ৪৭ জনে পৌঁছেছে। এর ফলে ২০১৯ সালে ১০ হাজারে ৮.৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী থেকে ২০২৫ সালে তা ১৫.১৬-তে উন্নীত হয়েছে।

তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি প্রকট। গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে (ডিজিএইচএস) চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত পদ ছিল ৩৮ হাজার ২৫৫টি, আর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে (ডিজিএনএম) নার্সদের জন্য পদ ছিল ৫০ হাজার ৮২৫টি। চলতি বছরের আগস্টের তথ্যানুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের ৯,৯৯০টি এবং নার্সদের ৪,৮৭০টি পদ শূন্য রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা 

সংকট সমাধানে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে প্রায় ১ লাখ নতুন পদ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের শূন্যপদ পূরণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার দৃশ্যমান অগ্রগতি আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে দেখা যাবে। 

এছাড়া আগামী বছরের শুরুতেই ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ সম্পন্ন হবে। উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য ২ হাজার ৫০০টি নতুন পদ সৃজন করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী আগামী কয়েক বছরে সরকারি স্বাস্থ্য খাতে ২৫ হাজার মিডওয়াইফারি নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া নার্সদের জন্য আরও ১৫ হাজার নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু চিকিৎসক বা শয্যাসংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। ডব্লিউএইচও-এর মানদণ্ড ছুঁতে হলে নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং চিকিৎসকদের সুষম অনুপাত নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নিয়োগ কাঠামোর বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ◉

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ ২৬ অক্টোবর ২০২৬