Sunday, 27 September 2026 Breaking News
সেন্টমার্টিনে প্রকৃতির অবিশ্বাস্য পুনর্জাগরণ, সংকটে জনজীবন

সেন্টমার্টিনে প্রকৃতির অবিশ্বাস্য পুনর্জাগরণ, সংকটে জনজীবন

13 August 2026 · বাংলাদেশ

বিস্তৃত নীল জলরাশি আছড়ে পড়ছে জনশূন্য সৈকতে। সাদা ফেনার গর্জনের বাইরে আর কোনো কোলাহল নেই। পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় নেই, জাহাজঘাটে নেই টিকিট কাটার হুড়োহুড়ি। গত প্রায় ছয় মাস ধরে সেন্টমার্টিন যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

একদিকে পর্যটক যাতায়াতে সরকারি কড়াকড়ি, অন্যদিকে বর্ষাকালীন বৈরী আবহাওয়া—এই দুইয়ে মিলে দ্বীপটিকে বাইরের পৃথিবী থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন করেই রেখেছে। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার আড়ালেই ঘটে চলেছে এক অভাবনীয় রূপান্তর।

মানুষের কোলাহল থামতেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সেন্টমার্টিনের মৃতপ্রায় প্রকৃতি। বালুচরে লাল কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকের বিস্তার, সৈকতে পাখির আনাগোনা এবং সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ ফিরে আসার কথা জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রকৃতির অবিশ্বাস্য পুনর্জাগরণ 

গত কয়েক দশকে মাত্রাতিরিক্ত পর্যটক, যত্রতত্র প্লাস্টিক দূষণ এবং অপরিকল্পিত কংক্রিটের জঞ্জালে দ্বীপটি তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। ১৯৯৯ সালে এটিকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইসিএ ঘোষণা করা হলেও, বাস্তবে এর ধ্বংসলীলা যেন থামছিল-ই না। তবে সরকারের নেওয়া কিছু কঠোর পদক্ষেপ এবং সাম্প্রতিক পর্যটক নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে দ্বীপের চিত্র জাদুকরীভাবে বদলাতে শুরু করেছে।

সৈকতে এখন আর যান্ত্রিক মোটরবাইকের দাপাদাপি নেই। রাতের বেলা সৈকতে নেই তীব্র আলোর জ্বলকানি। সাউন্ড বক্স বাজিয়ে বারবিকিউ পার্টি করা বা প্রবাল তুলে নেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কাজগুলো পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এই ১২টি সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের ফল হাতেনাতে মিলছে। দ্বীপের মৃতপ্রায় কেয়াবনগুলো ফুলে-ফলে ভরে উঠেছে। সৈকতের বালুচরে নির্ভয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে লাল কাঁকড়ার দল। শামুক আর ঝিনুকের বিচরণে সৈকত ফিরে পেয়েছে তার আদিম রূপ।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সামুদ্রিক প্রাণীদের ক্ষেত্রে। একসময় পর্যটকদের ভিড় এবং বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রবে সামুদ্রিক কাছিমেরা সৈকতে ডিম পাড়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। এখন সৈকতে কাছিমের ডিম ফোটানোর হ্যাচারিগুলোতে তুমুল ব্যস্ততা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’-এর পরিচালক কামরুল হাসান জানান, দ্বীপের ছেঁড়াদিয়া, দিয়ারমাথা এবং গোলদিয়ায় শৈবাল ও প্রবালের দারুণ বিস্তার ঘটছে। নতুন করে জেগে ওঠা প্যারাবনে সাপ, ব্যাঙ, প্রজাপতিসহ নানা প্রজাতির প্রাণীর দেখা মিলছে, যা তিন বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল।

মানুষের জীবনে ঘোর অমানিশা 

প্রকৃতি যখন তার পুরোনো রূপ ফিরে পেয়ে হাসছে, সেন্ট মার্টিনের মানুষের জীবনে তখন নেমে এসেছে অস্তিত্ব সংকটের ঘোর অমানিশা। পরিবেশ রক্ষার এই পদক্ষেপে জীববৈচিত্র্য বাঁচলেও, চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে দ্বীপের সাধারণ মানুষকে। দ্বীপের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ৭০০।

স্থানীয়দের বড় অংশ জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, দোকানদার ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত। পর্যটক না থাকায় হোটেল-রিসোর্ট, দোকান, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল ভাড়ার মতো মৌসুমি আয়ের পথ প্রায় বন্ধ। স্থানীয়দের দাবি, পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কাজ হারিয়ে কিংবা আয় কমে সংকটে পড়েছেন।

দ্বীপে ২৩০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট-কটেজ রয়েছে; পর্যটক না থাকলে বছরের বড় অংশই এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম থেমে যায়। এর সঙ্গে পর্যটক পরিবহন, খাবারের দোকান, ডাব-নারকেল বিক্রি, ভ্যান ও ইজিবাইক চালানো, মোটরসাইকেল-বাইসাইকেল ভাড়ার মতো ছোট ছোট আয়ের উৎসও শুকিয়ে যায়। ফলে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের ব্যয় শুধু বড় ব্যবসায়ীরা নয়, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের পরিবারও বহন করছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, দ্বীপ বাঁচাতে সরকারের উদ্যোগ অবশ্যই ভালো। তারাও চান দ্বীপ রক্ষা হোক। একই সাথে তারা তাদের পেটের ভাতের যোগানের নিশ্চয়তাও চান।

তারা জানান, সাগরে এখন জাল ফেললেও মাছ ওঠে না। একসময় পর্যটকদের ভ্যানে ঘুরিয়ে বা দোকানে বেচাকেনা করে বাড়তি আয় হতো। এখন সেসব বন্ধ। সংসার কীভাবে চালবে, সেই হিসাব আর মেলাতে পারছেন না তারা। দ্বীপের প্রায় ৫ হাজার খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থা একই রকম।

দ্বীপের ব্যবসায়ীদের অবস্থাও একইরকম। তারা বলেন, যে সৈকতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকত। গত কয়েক মাস ধরে দোকানগুলোতে তালা ঝুলছে। পরিবার নিয়ে চরম অর্থকষ্টে দিন পার হচ্ছে তাদের।

প্রকৃতির রুদ্ররোষ ও সুপেয় পানির হাহাকার অর্থনৈতিক এই ধ্বসের পাশাপাশি দ্বীপবাসীর জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বর্ষায় দ্বীপের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণাংশের বালিয়াড়ি দ্রুত সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

ভাঙনের কবলে পড়ে উপড়ে পড়ছে শত শত নারিকেল গাছ। সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সুপেয় পানির সংকট। মাটির তলার মিঠা পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে সমুদ্রের লোনা পানি। ফলে খাবার পানির তীব্র হাহাকার চলছে পুরো দ্বীপে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সংবাদমাধ্যমেক জানান, দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার ১২টি নির্দেশনা কঠোরভাবে মানা হচ্ছে। পাশাপাশি টেকনাফের সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে একটি আধুনিক জেটি নির্মাণের কাজ চলছে, যা চালু হলে পর্যটকদের যাতায়াত আরও সহজ ও নিরাপদ হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরও ১০০ কোটি টাকার নানা প্রকল্পের কথা বলছে, যা দ্বীপের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সুপেয় পানির সংকট দূর করবে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি আর প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতার ফাঁকে সেন্ট মার্টিনের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই—প্রকৃতি তো বাঁচল, কিন্তু তাদের বাঁচাবে কে? বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পরিবেশ রক্ষার এই একপেশে মডেলে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য হয়তো ফিরেছে, কিন্তু এখানকার মানুষের জীবনের স্পন্দন ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১৩ আগস্ট ২০২৬