➤ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে গভীর চাপে ফেলেছে। আমদানিনির্ভর এই অর্থনীতিতে জ্বালানির প্রবাহে সামান্য বিঘ্নও বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষি, পোশাক শিল্প এবং পরিবহন এই তিনটি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। যা সামগ্রিক অর্থনীতির উপর দীর্ঘমেয়াদি ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এলএনজির একটি বড় অংশ কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে, এবং এই সরবরাহ পুরোপুরি নির্ভরশীল হরমুজ প্রণালির উপর।

সাম্প্রতিক অস্থিরতায় কাতারের উৎপাদন স্থগিত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর ফলে জ্বালানির মজুত দ্রুত কমে আসছে এবং নতুন চালান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে উঠছে।

দেশে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের মজুত বর্তমানে কয়েক দিনের চাহিদা মেটানোর মতো অবস্থায় রয়েছে। পরিকল্পিত আমদানির তুলনায় বাস্তবে অনেক কম চালান নিশ্চিত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে অকটেন উৎপাদন নির্ভর করছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেলের চালানের উপর, যা এখনো পৌঁছায়নি। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অভ্যন্তরীণ পরিশোধন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও দেশীয় বাজারে মূল্য অপরিবর্তিত রাখায় সরকারকে বিপুল ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে। এই ভর্তুকি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা রাজস্ব ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

এই সংকটের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। বোরো মৌসুমের সেচ কার্যক্রম এখন তুঙ্গে, যেখানে উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজেলচালিত সেচপাম্পের উপর নির্ভরশীল। জ্বালানির ঘাটতির কারণে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, ফলে ফসল উৎপাদন সরাসরি হুমকির মুখে।

তিন ধরনের জ্বালানি বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো-তেল, গ্যাস এবং কয়লা। এর মধ্যে তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। গ্যাসের আমদানি তুলনামূলকভাবে কম। আবার কয়লার আমদানি বেশি। আর জ্বালানি হিসাবে তেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সব খাতে প্রভাব পড়েছে।

এই সংকট ক্রমেই জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিনটি খাত কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এছাড়াও জাতীয় বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রভাব পড়তে পারে। তবে ১০টি খাতে বেশি প্রভাব পড়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন : বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল (ডিজেল), গ্যাস ও কয়লার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তেল ও গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানির অভাবে শনিবার পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ ছিল। অন্য কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

এ অবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় লোডশেডিং বাড়িয়েছে সরকার। এতে দেশের প্রায় সব শিল্প ও সেবা খাতে প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে আবাসিক ভবনগুলোতে জেনারেটর চালানো হয়। এই জেনারেটরের মাধ্যমে এসি, ফ্যান এবং লিফট পর্যন্ত চলে। কিন্তু তেলের সংকটে সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।

পরিবহন খাত : পরিবহন খাতে বাস, ট্রাক, লঞ্চ, জাহাজ, বিমান এবং প্রাইভেটকার সবই জ্বালানিনির্ভর। প্রাইভেটকার ও বিমান ছাড়া সব যানবাহন ডিজেলে চলে। কিন্তু তেলের সংকটে বর্তমানে এর কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে না। এতে পণ্য পরিবহণে ভাড়া বেড়েছে। পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজ এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে।

এ ছাড়াও তেল সংকটের কারণে রাস্তায় প্রাইভেটকারের সংখ্যাও কমে গেছে। এতে পরিবহণের সঙ্গে জড়িত ড্রাইভার, হেলপার এবং অন্যান্য কর্মচারীদের আয়ও কমে যাচ্ছে।

শিল্প খাত : দেশে শিল্প উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হয়। গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকসহ সব কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেল লাগে। কিন্তু গত এক মাসে কোনো খাতেই পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রপ্তানি এবং শ্রমিকদের বেতন ভাতা। কারণ পণ্য উৎপাদন না হলে রপ্তানি কমবে। এতে আয় কমবে শ্রমিকদের। সামগ্রিকভাবে এটি অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে।

কৃষি : জ্বালানি চাহিদার অন্যতম খাত কৃষি। সেচপাম্প, ট্রাক্টর, ধান মাড়াই এবং পরিবহণসহ সবকিছুতেই জ্বালানি লাগে। এক্ষেত্রে একদিকে সরাসরি ডিজেল এবং অপরদিকে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ কম। ফলে আগামীতে কৃষি উৎপাদনে এর প্রভাব পড়বে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে।

বাণিজ্য : আমদানি-রপ্তানিসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে জ্বালানি প্রয়োজন। জাহাজ পরিবহণ, কনটেইনার, বন্দর কার্যক্রমের জন্য জ্বালানির বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সংকটে এ খাতগুলো অনেক ক্ষতিগ্রস্ত।

গৃহস্থালি খাত : বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান, জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ, ওভেন সবকিছুই চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন। এছাড়া রান্নায় প্রয়োজন গ্যাস ও বিদ্যুৎ। সাম্প্রতিক সংকটে গৃহস্থালির এ খাতেও প্রভাব পড়েছে।

সেবা খাত : দেশের সেবা খাতগুলোর অন্যতম হাসপাতাল, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) অন্যতম। বিদ্যুৎ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান চলা প্রায় অসম্ভব। আর জ্বালানি সংকটে খাতটিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

নির্মাণ শিল্প : দেশের নির্মাণ শিল্প খাতের মধ্যে রড-সিমেন্ট, ইটভাটা এবং নির্মাণ যন্ত্রপাতি অন্যতম। এর সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। চলমান সংকটে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

পর্যটন ও বিনোদন : দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত পর্যটন। এ খাতের সঙ্গে আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিনোদন পার্ক ও সামগ্রী সম্পৃক্ত। চলমান জ্বালানি সংকটে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে চলছে না।

টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি : মোবাইল টাওয়ার, নেটওয়ার্ক, ডাটা সেন্টারসহ এ খাতের সব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৬ এপ্রিল ২০২৬