
ঢাকা, ১৮ জুন ২০২৬: বেসরকারি খাতের উত্তরা ব্যাংকে নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশ্নফাঁস এবং প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে নিজের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির সিবিএ (CBA) সাধারণ সম্পাদক আবু মো. আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকে নিজের আধিপত্য ও দুর্নীতির নেটওয়ার্ক পাকাপোক্ত করতে সাবেক এমডিকে কৌশলে অপসারণ করে নতুন এমডি বসিয়েছেন তিনি।
আর এই প্রক্রিয়ায় গত দুই বছরে অন্তত দেড়শ কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছে তার সিন্ডিকেট। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখা এই নেতার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সিবিএ’র সাবেক নেতারা।
নজিরবিহীন মেয়াদ বৃদ্ধি
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরেই আহসান হাবিবের চাকরির স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তিনি প্রভাব খাটিয়ে নিজের চাকরির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে নিয়েছেন।
উত্তরা ব্যাংকের ইতিহাসে এভাবে মেয়াদ বৃদ্ধির ঘটনা নজিরবিহীন। মূলত ব্যাংকের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং সিবিএ-তে একক আধিপত্য ধরে রাখতেই তিনি এই অবৈধ পথ বেছে নিয়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশ্নফাঁস
সম্প্রতি উত্তরা ব্যাংকে ‘জুনিয়র অফিসার’ ও ‘ক্রেডিট অফিসার’ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠে আহসান হাবিব সিন্ডিকেট। জানা গেছে, অন্তত দুই শতাধিক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি ৬ লাখ টাকা করে অগ্রিম সংগ্রহ করেছেন তিনি। এর বিনিময়ে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং ভাইভায় উত্তীর্ণ করার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
◉ ২৩২ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়, ‘রাজনৈতিক ডিগবাজি’ দেলোয়ারের
তার বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মূল হোতা হিসেবে তার নাম উঠে আসে। সে সময় অন্তত ২৯ জনের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নেওয়ার প্রমাণ পায় গণমাধ্যম, যা নিয়ে যমুনা টেলিভিশনে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রচারিত হয়েছিল।

ছাত্রদের ব্যবহার করে এমডি অপসারণ নাটক
আহসান হাবিবের দুর্নীতির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো এমডি অপসারণ। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এমডি রবিউল হোসেনের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা পেতে ব্যর্থ হয়ে তিনি তাকে সরানোর ছক কষেন। এজন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশকে ভুল বুঝিয়ে তৎকালীন এমডির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন রবিউল হোসেন। তবে কাজ হাসিলের পর ছাত্রদের দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিই রাখেননি এই সিবিএ নেতা, যার অডিও প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্দোলনকারী এক সাবেক ছাত্রনেতা বলেন, “আমাদের ভুল বোঝানো হয়েছিল। তৎকালীন এমডি রবিউলকে অপসারণের পেছনে আহসান হাবিবের মূল লক্ষ্য ছিল নিজের পছন্দের নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়া। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, এই এমডি বদলের বাণিজ্য থেকে তিনি প্রায় ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।”
রাজনৈতিক ডিগবাজি
এদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভোল পাল্টেছেন আহসান হাবিব। একসময় আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও যুবলীগ নেতাদের নিয়ে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলা এই নেতা এখন নিজেকে বিএনপির ‘ত্যাগী নেতা’ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন।
তবে তার এই রাজনৈতিক ডিগবাজি এবং অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরে ইতিমধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সিবিএ’র সাবেক নেতারা।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে উত্তরা ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মো. আবুল হাসেমের অফিশিয়াল নম্বরে (শেষাংশ-৪০২৩) একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন কেটে দেন।
◉ এডিপিতে ‘কাগুজে প্রকল্প’ ১০৬৩, মাত্র ১ লাখে ‘জীবিত’ ৭৭
অন্যদিকে, অভিযুক্ত সিবিএ সাধারণ সম্পাদক আবু মো. আহসান হাবিবের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে (শেষাংশ-০১৪৮) বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তার বক্তব্য জানতে উত্তরা ব্যাংকের সিবিএ কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
নিউজ নাউ বাংলা/এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১৮ জুন ২০২৬



